চাকরি থেকে আয় : আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী বেতন, ভাতা ও করছাড়ের সম্পূর্ণ গাইড

calendar_today

চাকরি থেকে আয় (Income from Salary) বলতে কি শুধু মাসিক বেতনই বোঝায়? অনেক করদাতা এই ভুল ধারণা নিয়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন এবং পরে অডিটে সমস্যায় পড়েন। আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৩২ অনুযায়ী, চাকরির আয়ের পরিধি অনেক বিস্তৃত, এতে বেতন ছাড়াও ভাতা, পারকুইজিট এবং নানা অনার্থিক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত। এই ব্লগে আপনি জানতে পারবেন কোন আয় করযোগ্য, কোন ভাতা করমুক্ত এবং আয়কর রিটার্নে কীভাবে সঠিকভাবে তথ্য প্রদর্শন করবেন।

চাকরি থেকে আয় কী?

আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ৩২ অনুযায়ী, চাকরি থেকে আয় হলো নিয়োগকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত বা বকেয়া হওয়া সমস্ত আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধার সমষ্টি। অর্থাৎ, শুধু নগদ বেতন নয়, চাকরির কারণে পাওয়া প্রতিটি সুবিধাই এই খাতের অন্তর্গত।

আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী করযোগ্য চাকরির আয়ের তালিকা

১. বেতন, মজুরি ও পারিশ্রমিক: মূল বেতন (Basic Salary), মজুরি বা পারিশ্রমিক, এটি করযোগ্য বেতন আয়ের সবচেয়ে পরিচিত উপাদান।

২. ভাতাসমূহ (Allowances): বাড়ি ভাড়া ভাতা (House Rent Allowance), চিকিৎসা ভাতা (Medical Allowance), যাতায়াত ভাতা (Conveyance Allowance), উৎসব ভাতা ও বোনাস (Festival Bonus), ওভারটাইম, কমিশন এবং ছুটি নগদায়ন (Leave Encashment),  এগুলো সবই করযোগ্য আয়ের অংশ।

৩. পারকুইজিট বা অনার্থিক সুবিধা (Perquisite): নিয়োগকর্তা যদি বিনামূল্যে বা হ্রাসকৃত ভাড়ায় আবাসন, কোম্পানি গাড়ি, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ বা শেয়ার অপশন (Employee Share Scheme) প্রদান করেন, তবে সেগুলো সবই করযোগ্য চাকরির আয় হিসেবে গণ্য হবে।

৪. অন্যান্য করযোগ্য প্রাপ্তি: অগ্রিম ও বকেয়া বেতন, আনুতোষিক (Gratuity), পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ডে নিয়োগকর্তার কন্ট্রিবিউশন এবং পূর্ববর্তী বা পরবর্তী নিয়োগকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত যেকোনো সুবিধাও এর অন্তর্ভুক্ত।

কোন আয় করমুক্ত? (Tax Exempt Income from Salary)

আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী কিছু প্রাপ্তি করমুক্ত। চাকরির দায়িত্বে প্রকৃতপক্ষে ব্যয়িত ভ্রমণ ভাতা, হৃদযন্ত্র, বৃক্ক, ক্যান্সার ইত্যাদি গুরুতর রোগের চিকিৎসা ব্যয় (শেয়ারহোল্ডার নন এমন কর্মচারীর ক্ষেত্রে) এবং নিয়োগকর্তা প্রদত্ত গ্রুপ বীমার প্রিমিয়াম করমুক্ত হিসেবে গণ্য হয়। 

মোট আয় হতে করছাড়

বেসরকারি করদাতাদের জন্য একটি বড় সুবিধা হলো, মোট চাকরির আয়ের এক-তৃতীয়াংশ অথবা ৫,০০,০০০ টাকা (যেটি কম) করযোগ্য আয় থেকে বাদ দেওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, বার্ষিক চাকরির আয় ১২,০০,০০০ টাকা হলে এক-তৃতীয়াংশ হয় ৪,০০,০০০ টাকা। যেহেতু এটি ৫ লক্ষের কম, তাই ৪ লক্ষ টাকা করমুক্ত এবং বাকি ৮ লক্ষ টাকা করযোগ্য।

সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। SRO নং ২২৫-আইন/আয়কর-৭/২০২৩ অনুযায়ী তাদের শুধু মূল বেতন, উৎসব ভাতা ও বোনাস করযোগ্য। তবে তারা উপরোক্ত এক-তৃতীয়াংশ ছাড়ের সুবিধা পাবেন না।

💼 Tax Consultant
আয়কর সংক্রান্ত পরামর্শ ও ট্যাক্স রিটার্ন সাবমিটে সহযোগিতার জন্য...

চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে আয়কর অডিটে কী কী যাচাই করা হয়?

২০২৫ সালের অডিট নির্দেশিকা অনুযায়ী আয়কর কর্মকর্তারা তিনটি বিষয় মূলত যাচাই করেন। প্রথমত, রিটার্নে দেখানো বেতন আয় ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের জমার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফ্ল্যাট বা গাড়ি কেনার ঋণের বার্ষিক সুদ IT-10BB ফর্মে সঠিকভাবে দেখানো হয়েছে কিনা তা যাচাই করা হয়। তৃতীয়ত, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী ওই কোম্পানি থেকে ঋণ নিলে তা আয়কর আইনের ধারা ২(৮১)(ঘ) অনুযায়ী লভ্যাংশ (Dividend) হিসেবে গণ্য হতে পারে। 

সর্বশেষে, চাকরি থেকে আয় (Income from Salary Bangladesh) বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু নগদ বেতনকেই করযোগ্য মনে করা। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী আপনার সকল ভাতা, পারকুইজিট ও সুবিধার সঠিক হিসাব রাখুন, ব্যাংক স্টেটমেন্টের সাথে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করুন এবং নির্ধারিত করছাড় সুবিধা নিন।

Share to:

CATEGORIES:

Popular Posts