কোম্পানির আয়কর রিটার্ন দাখিলে বিলম্ব: জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিস্তারিত

calendar_today

কোম্পানি হিসেবে আয়কর রিটার্ন সঠিক সময়ে দাখিল করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশের আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের (ট্যাক্স ডে) মধ্যে রিটার্ন না দাখিল করলে কোম্পানি বিভিন্ন ধরনের জরিমানা এবং আইনি ঝামেলার সম্মুখীন হতে পারে। এই ব্লগে সেই সকল বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

কোম্পানির আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা

সাধারণ সময়সীমা: কোম্পানির আয়বর্ষ শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ (পনেরো)ই মার্চ ট্যাক্স ডে

বিশেষ শর্ত: কোম্পানির আয়বর্ষ সমাপ্তির পরবর্তী নবম মাসের পনেরোতম দিন সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ (পনেরো) তম দিনের পূর্বের তারিখে পড়ে, সেইক্ষেত্রে আয়বর্ষ সমাপ্তির পরবর্তী সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ (পনেরো) তম দিন হবে কোম্পানির জন্য ট্যাক্স ডে।

সহজ কথায় বলতে গেলে বলা যায়: যেসকল কোম্পানির আয়বর্ষ জুলাই–জুন (সাধারণত অধিকাংশ কোম্পানি), তাদের জন্য ট্যাক্স ডে হলো ১৫ই মার্চ। আর যেসকল কোম্পানির আয়বর্ষ জানুয়ারি–ডিসেম্বর (যেমন: ব্যাংক বা বীমা কোম্পানি), তাদের ক্ষেত্রে ১৫ই সেপ্টেম্বর

তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনেক সময় সার্কুলারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তারিখের পরে অতিরিক্ত সময়ের ঘোষণা দিয়ে থাকে। এনবিআর সময় বৃদ্ধি না করলেও করদাতার আবেদনের প্রেক্ষিতে উপ-কর কমিশনার দুই মাস সময় বৃদ্ধি করে দিতে পারেন। যৌক্তিক কারণে আরও দুই মাস, অর্থাৎ সর্বমোট চার মাস পর্যন্ত কোম্পানির আয়কর রিটার্ন দাখিলের জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আয়কর আইন অনুযায়ী ১৭৪ ধারায় ২% হারে প্রতি মাসের জন্য অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হয়।

💼 Tax Consultant
আয়কর সংক্রান্ত পরামর্শ ও ট্যাক্স রিটার্ন সাবমিটে সহযোগিতার জন্য...

কোম্পানির রিটার্ন দাখিলে বিলম্বে জরিমানা সমূহ

রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য আইনের ধারা ২৬৬ অনুযায়ী উপকর কমিশনার কোম্পানির ওপর জরিমানা আরোপ করতে পারেন।

প্রাথমিক জরিমানা: সর্বশেষ কর নির্ধারণী অনুযায়ী প্রদেয় করের ১০% (দশ শতাংশ) অথবা ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা — এই দুইটির মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অর্থ প্রাথমিক জরিমানা হিসেবে দিতে হবে।

মাসিক জরিমানা: যদি রিটার্ন দাখিলে বিলম্ব অব্যাহত থাকে, তবে প্রতি মাসের জন্য অতিরিক্ত ১০০০ (এক হাজার) টাকা হারে জরিমানা আরোপ করা হবে।

বিলম্ব সুদ (ধারা ১৭৪)নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে ধারা ১৭৪ অনুযায়ী প্রদেয় করের ওপর প্রতি মাসে ২% (দুই শতাংশ) হারে বিলম্ব সুদ (Delay Interest) আরোপ করা হবে। এই সুদ সর্বোচ্চ ২৪ মাসে ৪৮% পর্যন্ত হতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যদিও উপকর কমিশনারের কাছ থেকে সময় বৃদ্ধির অনুমতি পাওয়াও যায়, তারপরও এই বিলম্ব সুদ পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।

নতুন কোম্পানির জন্য বিশেষ সীমাবদ্ধতাযেসব কোম্পানি আগে কখনও কর নির্ধারণ (Assessed) করেনি অথবা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত, তাদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা হবে

কর অব্যাহতি বা হ্রাসকৃত কর হারের সুবিধা হারানো

সঠিক সময়ে রিটার্ন না দাখিল করলে কোম্পানি আইনের অধীনে প্রাপ্য বিভিন্ন ধরনের কর অব্যাহতি (Tax Exemptions) বা হ্রাসকৃত কর হারের সুবিধা হারাতে পারে। অর্থাৎ, দেরিতে রিটার্ন দাখিল করলে কোম্পানিকে সাধারণ হারের চেয়ে বেশি কর প্রদান করতে হতে পারে, যা আর্থিক দিক থেকে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

একতরফা কর নির্ধারণের ঝুঁকি 

যদি কোনো কোম্পানি রিটার্ন দাখিল না করে, তবে উপকর কমিশনার তাঁর 'সর্বোত্তম বিচারিক জ্ঞান' (Best Judgment Assessment) প্রয়োগ করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কর নির্ধারণ করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে কোম্পানির প্রকৃত আয়ের চেয়ে বেশি কর চাপানোর ঝুঁকি রয়েছে, যা কোম্পানির জন্য আর্থিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।

পরিশেষে এই কথা বলা যায় যে, আয়কর রিটার্ন সময়মতো দাখিল করা শুধু একটি আইনি দায়িত্ব নয়, এটি কোম্পানির আর্থিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরিমানা, বিলম্ব সুদ, কর সুবিধা হারানো এবং একতরফা কর নির্ধারণের ঝুঁকি এড়াতে সর্বদা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিক তথ্য দিয়ে রিটার্ন দাখিল করা উচিত।

Share to:

CATEGORIES:

Popular Posts