
আয়কর রিটার্ন দাখিল করা প্রতিটি করদাতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাংলাদেশে আয়কর আইন অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক করদাতা নানা কারণে সময়মতো আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারেন না। আয়কর রিটার্ন না দিলে কি হবে এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই থাকে এবং এর উত্তর জানা অত্যন্ত জরুরি। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা এবং সময়মতো আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে কী কী সমস্যা হতে পারে।
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা
বাংলাদেশে আয়কর বছর হল ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। সাধারণত ব্যক্তি করদাতাদের জন্য আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ হল পরবর্তী বছরের ৩০ নভেম্বর।
তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতি বছর সার্কুলারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তারিখের পরে অতিরিক্ত সময়ের ঘোষণা করে থাকেন। অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা সাধারণত ৩০ নভেম্বর থেকে ১ মাস কিংবা ২ মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে।
সময়মতো রিটার্ন না দিলে কী ধরনের জরিমানা হয়?
আয়কর আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে করদাতাকে জরিমানা দিতে হয়। সময়মতো রিটার্ন না দিলে আয়কর আইন ২০২৩ এর ১৭৪ ধারা অনুযায়ী কর নির্ধারিত হয়। যা সময়মতো রিটার্ন সাবমিট করলে যে পরিমাণ কর দেওয়া লাগতো তার উপর প্রতি মাসের জন্য ২% হারে সর্বোচ্চ ৪৮% পর্যন্ত জরিমানা দেওয়া লাগবে।
এছাড়া করদাতা যদি আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ১৬৬, ১৭২, ১৯১, ১৯৩ বা ২১২ অনুসারে রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হন তাহলে ২৬৬ ধারা অনুযায়ী নিম্নে এক হাজার টাকা, বা সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের উপর ধার্যকৃত করের উপর ১০% হারে জরিমানা করা হতে পারে। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। দীর্ঘ সময় রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং করদাতার আর্থিক বোঝা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
কর অব্যাহতি এবং ছাড় থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি
সময়মতো আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে আপনি বিভিন্ন কর অব্যাহতি এবং রেয়াত থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ, জীবন বীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করলে কর রেয়াত পাওয়া যায়। কিন্তু দেরিতে রিটার্ন দিলে এই সুবিধাগুলো নাও পেতে পারেন। এনবিআর সাধারণত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলেই এসব সুবিধা প্রদান করে। তাই কর রেয়াত পেতে হলে অবশ্যই সময়মতো রিটার্ন দাখিল করা উচিত।
ব্যাংক লেনদেনে সমস্যা
টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) বাংলাদেশে বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ক্রেডিট কার্ড নেওয়া, FDR বা DPS এর ক্ষেত্রেই টিআইএন সার্টিফিকেট দিয়ে নবায়নকৃত প্রাপ্তি স্বীকার পত্র জমা না দিলে ৫% অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়।
ব্যাংকগুলোও এখন নিয়মিত আয়কর রিটার্নের প্রমাণ চায়। বিশেষ করে বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে রিটার্নের কপি জমা দিতে হয়। রিটার্ন না থাকলে আপনার লেনদেন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
ব্যবসায়িক লাইসেন্স ও অনুমতিপত্র পেতে বিলম্ব
ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের জন্য সময়মতো আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্স, বিভিন্ন পেশাগত সনদ পেতে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণ লাগে।
যদি আপনি সময়মতো রিটার্ন জমা না দেন, তাহলে এসব লাইসেন্স ও অনুমতিপত্র পেতে বিলম্ব হবে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেতে পারে। এতে আপনার ব্যবসা বা পেশায় মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষ করে সরকারি টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে হলে অবশ্যই আপডেট আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণ দিতে হয়। তাই ব্যবসায়ীদের জন্য নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করা খুবই জরুরি।
বিদেশ ভ্রমণে ভিসা পেতে অসুবিধা
ইউরোপ আমেরিকা কানাডা অস্ট্রেলিয়া সহ অনেক দেশে ভিসা আবেদনের সময় আয়কর রিটার্নের কপি চাওয়া হয়। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে ভিসা পেতে আবেদনকারীর আর্থিক স্বচ্ছতার প্রমাণ হিসেবে আয়কর রিটার্ন দেখানো লাগে।
যদি আপনার কাছে সাম্প্রতিক আয়কর রিটার্নের কপি না থাকে, তাহলে ভিসা পেতে সমস্যা হতে পারে। এমনকি ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানও হতে পারে। তাই যারা নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন বা ভবিষ্যতে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে, তাদের অবশ্যই সময়মতো রিটার্ন দাখিল করা উচিত।
এছাড়া স্টুডেন্ট ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট বা অভিবাসনের ক্ষেত্রেও আয়কর রিটার্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সুতরাং এই বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ে জটিলতা
বাংলাদেশে বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার মধ্যে জমি, ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের সময় আয়কর রিটার্ন দেখাতে হয়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট মূল্যের উপরে সম্পত্তি লেনদেন করলে আয়কর রিটার্নের কপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
যদি আপনার কাছে আপডেট আয়কর রিটার্ন না থাকে, তাহলে সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন বিলম্বিত হতে পারে। এতে আপনার সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হবে। এখানে আরেকটি বিষয় ঘটে থাকে, এই বিড়ম্বনা এড়াতে দলিল লেখক আপনাকে না জানিয়েই আপনার নামে ট্যাক্স রিটার্ন সাবমিট করে দিতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে একটি অপরাধ এবং আপনার ভবিষ্যতের জন্য বিরাট জরিমানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মতো কাজ হবে। তাই ট্যাক্স রিটার্ন সাবমিট করার ক্ষেত্রে আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
ঋণ ও আর্থিক সহায়তা পেতে বাধা
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে হলে আয়কর রিটার্ন একটি অপরিহার্য দলিল। বাড়ি নির্মাণের জন্য হোম লোন, গাড়ি কেনার জন্য কার লোন, ব্যবসায়িক ঋণ বা ব্যক্তিগত ঋণ, সব ক্ষেত্রেই আয়কর রিটার্ন চাওয়া হয়।
এছাড়াও সময়মতো আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে বহুবিধ ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই প্রতিটি করদাতার উচিত এনবিআরের নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা এবং নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করা। শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে, পর্যাপ্ত সময় থাকা অবস্থায় সঠিক ভাবে রিটার্ন সাবমিট করা। এতে শুধু ব্যক্তিগত সুবিধাই নয়, দেশের উন্নয়নেও অবদান রাখা হয়।
মনে রাখবেন, আয়কর রিটার্ন দাখিল কোনো জটিল প্রক্রিয়া নয়। প্রয়োজনে কর পরামর্শকের সাহায্য নিতে পারেন। তবে যাই করুন না কেন, সময়মতো রিটার্ন দাখিল করা নিশ্চিত করুন এবং একজন আইনমান্যকারী নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব পালন করুন।