
অনেকের মনে প্রশ্ন, টিআইএন সার্টিফিকেট একবার নিবন্ধন করার পর সেটি বাতিল করা সম্ভব কি না? উত্তর হচ্ছেঃ হ্যাঁ, আয়কর আইন ২০২৩-এর ২৬২ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও প্রক্রিয়া সাপেক্ষে টিআইএন বাতিল করার সুযোগ রয়েছে। এই ব্লগ পোস্টে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব আইন অনুযায়ী কখন, কীভাবে এবং কতদিনে টিন বাতিল করা যায়।
টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার আবেদন গ্রহণ করার প্রধান কারণসমূহ
- টানা ৩ বছর করযোগ্য আয় না থাকাঃ যদি কোনো করদাতার গত তিন বছর ধরে কোনো করযোগ্য আয় না থাকে এবং ভবিষ্যতেও করযোগ্য আয় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকে, সেক্ষেত্রে টিআইএন বাতিলের জন্য আবেদন করা যায়।
- মৃত্যু বা প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তিঃ করদাতার মৃত্যু হলে অথবা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি পুরোপুরি বন্ধ বা বিলুপ্ত হয়ে গেলে টিআইএন বাতিল করা যায়।
- স্থায়ীভাবে দেশ ত্যাগঃ করদাতা যদি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এবং বাংলাদেশে তার আয়ের কোনো উৎস না থাকে, তাহলে টিআইএন বাতিলের জন্য আবেদন করতে পারেন।
- একাধিক নিবন্ধনঃ যদি একই ব্যক্তির নামে ভুলবশত একাধিক টিআইএন নিবন্ধন হয়ে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত টিআইএনটি বাতিল করা যায়। কর দাতার পাসপোর্ট দিয়ে টিন সার্টিফিকেট খোলা আছে, কিন্তু সে ভুলবশত আবার এনআইডি দিয়ে টিন সার্টিফিকেট খুলে ফেলেছে।
- ভুল নিবন্ধনঃ কোনো ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বা ভুলবশত নিবন্ধন হয়ে থাকলে সেটি বাতিলের আবেদন করা যায়।
টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার নিয়ম
- ধাপ ১: আবেদন দাখিলঃ করদাতাকে সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শিয়ে উপকর কমিশনারের (DCT) কাছে নিবন্ধন বাতিলের জন্য লিখিত আবেদন করতে হবে।
- ধাপ ২: অনুসন্ধান প্রক্রিয়াঃ আবেদন পাওয়ার পর উপকর কমিশনার আবেদনকারীর তথ্য যাচাই-বাছাই এবং প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান পরিচালনা করেন। এই পর্যায়ে করদাতার আয়ের উৎস, বিগত বছরগুলোর রিটার্ন দাখিলের ইতিহাস এবং আবেদনে উল্লেখিত কারণের সত্যতা যাচাই করা হয়।
- ধাপ ৩: সিদ্ধান্ত গ্রহণঃ অনুসন্ধান শেষে উপকর কমিশনার যদি সন্তুষ্ট হন যে সংশ্লিষ্ট করদাতার নিবন্ধনটি বাতিলযোগ্য, তবেই তিনি সেটি বাতিল বা নিষ্ক্রিয় করার আদেশ প্রদান করেন।
TIN Certificate বাতিল করার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
- যথাযথ কারণ উল্লেখ করে আবেদনপত্র
- পূর্ববর্তী বছরগুলোর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র
- বকেয়া কর পরিশোধের প্রমাণ (যদি থাকে)
- জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি
- TIN সার্টিফিকেটের মূল কপি
- মৃত্যু/বিলুপ্তি/স্থায়ী দেশত্যাগের প্রমাণপত্র (যেক্ষেত্রে প্রযোজ্য)
টিন বাতিল করার আবেদন কোথায় জমা দিবেন?
আপনার সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের উপকর কমিশনারের অফিসে আবেদন জমা দিতে হবে।
TIN বাতিল করা মানে কী?
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন যে, আইনের ২৬২(৫) উপধারা অনুযায়ী নিবন্ধন 'বাতিল' হওয়ার অর্থ হলো উক্ত টিআইএন বা ই-টিআইএন নম্বরটি নিষ্ক্রিয় (Inactive) বা সুপ্ত (Dormant) করে রাখা। এর ফলে করদাতার তথ্য ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকলেও টিআইএনটি আর কার্যকর থাকে না এবং এটি ব্যবহার করে আর কোনো লেনদেন বা রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকে না।
TIN Certificate বাতিল করতে কতদিন সময় লাগে?
আয়কর আইন ২০২৩-এ টিআইএন বাতিলের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমার উল্লেখ নেই। প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করে:
- সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের দাপ্তরিক কার্যক্রম
- অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা
- করদাতার প্রদত্ত তথ্যের সত্যতা
- উপকর কমিশনারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়
- বাতিল করার আবেদনটি এনবিআরে প্রেরণ
যেহেতু আইনে তদন্ত বা অনুসন্ধানের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়নি, তাই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
পরিশেষে বলব, টিআইএন বাতিল করা সম্ভব। তবে মনে রাখবেন, টিআইএন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে এটি প্রয়োজন হয়। তাই বাতিল করার আগে ভালোভাবে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।