ন্যূনতম কর (Minimum Tax) কেন অনেক করদাতার জন্য অন্যায্য?

calendar_today

আপনি একজন ব্যাক্তি করদাতা, আপনার কর দায় ১ টাকা বা রেয়াতের কারণে আপনি উল্টু টাকা ফেরত পাওয়ার মত অবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে ন্যূনতম কর ব্যবস্থায় কারণে প্রকৃত আয় খুব কম হলেও একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কর দিতে হয়। আবার আপনি একজন ব্যবসায়ী, আপনার প্রতিষ্ঠানের কোন আয় না থাকলেও আপনার টার্নওভারের ওপর ভিত্তি করে মিনিমাম ট্যাক্স দিতে বাধ্য হন। এই করব্যবস্থা করদাতার জন্য শাস্তিমূলক। এই নীতির ফলে অধিকাংশ করদাতা সঠিক ভাবে রিটার্ন দাখিলেই আগ্রহ হারান, যা রাজস্ব ব্যবস্থার জন্যও ক্ষতিকর। মিনিমাম ট্যাক্স দুটি প্রধান ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, একটি হলো ব্যক্তি শ্রেণির ন্যূনতম কর এবং অপরটি হলো কোম্পানির ন্যূনতম কর হার। দুটি ক্ষেত্রেই যুক্তির বাইরে কর আরোপের অভিযোগ রয়েছে।

ব্যক্তি শ্রেণির ন্যূনতম কর ২০২৫-২৬

আপনি যদি একজন ব্যক্তি শ্রেণির করদাতা হন, তাহলে আপনার বসবাসের এলাকার এবং কর্মস্থলের ওপর ভিত্তি করে আপনার ন্যূনতম কর হার নির্ধারিত হবে। ২০২৫-২৬ করবর্ষে ন্যূনতম করের পরিমাণগুলো হলো:
  • ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা: যদি করদাতা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন অথবা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার হন।
  • ৪,০০০ (চার হাজার) টাকা: যদি করদাতা অন্য যেকোনো সিটি কর্পোরেশন এলাকার হন।
  • ৩,০০০ (তিন হাজার) টাকা: যদি করদাতা সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে যেকোনো স্থানের হন।
💼 Tax Consultant
আয়কর সংক্রান্ত পরামর্শ ও ট্যাক্স রিটার্ন সাবমিটে সহযোগিতার জন্য...

কোম্পানির ন্যূনতম কর হার

আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যূনতম কর (Minimum Tax) ব্যবস্থাটি করদাতার ধরন এবং আয়ের উৎসের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। নিচে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য ন্যূনতম করের প্রধান ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরা হলো:

মোট প্রাপ্তি বা টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম কর

যেসকল করদাতা (কোম্পানি বা ফার্ম) ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন, তাদের লাভ বা লোকসান নির্বিশেষে মোট প্রাপ্তি (Gross Receipts) বা টার্নওভারের ওপর নির্দিষ্ট হারে ন্যূনতম কর দিতে হয়। বিভিন্ন খাতের জন্য ২০২৫-২০২৬ কর বছরের জন্য ন্যূনতম কর হারগুলো নিম্নরূপ:

  • সাধারণ কোম্পানি বা ফার্ম: মোট প্রাপ্তির ১%
  • সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল বা অন্যান্য তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক: মোট প্রাপ্তির ৩%
  • কার্বোনেটেড বেভারেজ (Carbonated Beverage) ও মিষ্টি পানীয় (Sweetened Beverage) প্রস্তুতকারক: মোট প্রাপ্তির ৩%
  • মোবাইল ফোন অপারেটর: মোট প্রাপ্তির ১.৫%
  • নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা: বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর প্রথম ৩ (তিন) বছরের জন্য ন্যূনতম কর হার হবে মোট প্রাপ্তির মাত্র ০.১% 

উৎসে কর কর্তন (TDS) সংক্রান্ত ন্যূনতম কর

কিছু নির্দিষ্ট আয়ের উৎসের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ কর উৎসে কর্তন করা হয়, তাকে ওই আয়ের জন্য ন্যূনতম কর বা চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আয়কর আইন ২০২৩ এর ১৬৩ ধারা অনুযায়ী টিডিএস (TDS) সংক্রান্ত ন্যূনতম করের প্রধান খাতসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  • পণ্য আমদানি: পণ্য আমদানির সময় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আদায়কৃত আগাম কর।
  • পণ্য সরবরাহ ও চুক্তি সম্পাদন: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পণ্য সরবরাহ বা ঠিকাদারি কাজের বিপরীতে অর্থ প্রদানের সময় যে কর কাটা হয়।
  • সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিক্রয়: স্থাবর সম্পত্তি বা জমি বিক্রয় বা হস্তান্তরের সময় যে কর সংগ্রহ করা হয়।
  • রপ্তানি আয়: পণ্য বা সেবা রপ্তানির বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের ওপর কর্তিত কর।
  • জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ: সরকার কর্তৃক জমি অধিগ্রহণের ফলে প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অর্থের ওপর যে কর কাটা হয়।
  • সঞ্চয়ী আমানতের সুদ: ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা আমানতের ওপর প্রাপ্ত সুদের ওপর কর্তিত কর।
  • কমিশন বা ফিস: বিভিন্ন ধরনের পেশাগত সেবা, কমিশন বা ফিসের ওপর কর্তিত কর। 
  • তামাক পণ্য বিক্রয়: সিগারেট, বিড়ি, জর্দা বা গুল প্রস্তুতকারকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের ওপর সংগৃহীত কর।
  • বাড়ি বা সম্পত্তি ভাড়া: বাড়ি বা জায়গা ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর কর্তিত কর।

ন্যূনতম করের সাধারণ কিছু নিয়ম

  • লাভ বা লোকসান নির্বিশেষে: ব্যবসায়িক লোকসান থাকলেও টার্নওভারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত ন্যূনতম কর অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে।
  • উচ্চতর পরিমাণ প্রযোজ্য: যদি কোনো করদাতার প্রকৃত আয়ের ওপর গণনাকৃত সাধারণ কর এবং ন্যূনতম করের মধ্যে পার্থক্য থাকে, তবে করদাতাকে উচ্চতর পরিমাণটি পরিশোধ করতে হয়।
  • সমন্বয়: ন্যূনতম কর অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত দায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা পরবর্তী বছরের লোকসানের সাথে সমন্বয়ের সুযোগ সীমিত করে দেয়।

ন্যূনতম কর অন্যায্য বা কঠোর মনে হইয়ার কারণ সমূহ

আয়কর আইন ২০২৩-এর বিধানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ন্যূনতম কর (Minimum Tax) ব্যবস্থাটি করদাতার জন্য কেন অন্যায্য বা কঠোর মনে হতে পারে, তার বেশ কিছু জোরালো কারণ রয়েছে। সাধারণ করদাতার দৃষ্টিতে এটি অন্যায্য মনে হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • আয়ের পরিবর্তে প্রাপ্তির ওপর কর: আয়করের মূল নীতি হলো ব্যক্তির ‘আয়’ বা ‘মুনাফার’ ওপর কর প্রদান করা। কিন্তু ন্যূনতম করের ক্ষেত্রে আপনার প্রকৃত মুনাফা কত হলো তা বিবেচনা না করে করদাতার ‘মোট প্রাপ্তি’ (Gross Receipts) বা টার্নওভারের ওপর কর ধার্য করা হয়। এর ফলে একজন করদাতার ব্যবসায়িক খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত আয় খুব সামান্য হলেও, তাকে বড় অংকের কর দিতে হতে পারে।
  • লোকসান হলেও কর দিতে হয়: করদাতার জন্য সবচেয়ে কঠিন দিক হলো এটি। আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো আয়বর্ষে করদাতার ব্যবসায় লাভ হোক বা লোকসান, ন্যূনতম কর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে করদাতা যখন নিজেই আর্থিক সংকটে থাকেন, তখনও রাষ্ট্রকে এই কর দিতে হয়, যা সাধারণ ব্যবসায়িক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী মনে হতে পারে।
  • প্রকৃত করদায়ের চেয়ে অনেক বেশি কর: ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে, তার আয় যদি করযোগ্য সীমার সামান্য উপরেও থাকে এবং হিসাব অনুযায়ী করের পরিমাণ মাত্র ১ টাকাও হয়, তবুও তাকে এলাকাভেদে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা ন্যূনতম কর দিতে হয়। এখানে করদাতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার চেয়ে আইনের নির্ধারিত সীমাটি বড় হয়ে দাঁড়ায়, যা অনেক সময় স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য একটি অতিরিক্ত বোঝা।
  • ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও মুনাফার হারের পার্থক্য: বিভিন্ন ব্যবসার মুনাফার হার (Profit Margin) ভিন্ন হয়। যেমন, কোনো পাইকারি ব্যবসায় অনেক বেশি পণ্য বিক্রি করেও খুব সামান্য লাভ থাকে। আইনের ধারা অনুযায়ী মোট প্রাপ্তির ওপর একটি নির্দিষ্ট হার ন্যূনতম কর ধরা হয়। এর ফলে অনেক কম মুনাফার ব্যবসার ক্ষেত্রে এই ন্যূনতম করই তার সব মুনাফা খেয়ে ফেলতে পারে।
  • সমন্বয়ের সুযোগের অভাব: অনেক ক্ষেত্রে এই ন্যূনতম করকে চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে কোনো বছর বেশি কর দেওয়া হলে পরবর্তী বছরের লোকসানের সাথে তা সমন্বয় করার সুযোগ করদাতার জন্য সীমিত থাকে।

সরকারের পক্ষ থেকে রাজস্ব নিশ্চিত করার জন্য এই নিয়ম করা হলেও, এটি করদাতার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বা লোকসানের বাস্তবতা বিবেচনা করে না বলেই অনেক ক্ষেত্রে এটি অন্যায্য বা কঠোর হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রথার পরিবর্তন হউয়া উচিৎ।

Share to:

CATEGORIES:

Popular Posts