অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় যে ৫টি ভুল সবচেয়ে বেশি হয়

calendar_today

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন (e-Return) দাখিল করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। ঘরে বসেই কয়েক মিনিটে আপনার রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সহজ প্রক্রিয়াটিতেই লুকিয়ে আছে কিছু সূক্ষ্ম জায়গা, যেখানে একটু অসাবধান হলে আপনাকে পরবর্তীতে বড় ঝামেলায় পড়তে হতে পারে।

অনেক করদাতা মনে করেন “আমার ফাইল ছোট, কর অফিস আমাকে ধরবে না।” কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২২–২৩ কর বছরে ১৫ হাজার আয়কর রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়েছে, যেখানে অধিকাংশই ছিল তথাকথিত ছোট ফাইল। এই পরিস্থিতিতে অনেক করদাতা নিজে আয়কর আইনের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় বেখেয়ালিভাবে ভুল রিটার্ন দাখিল করছেন, আবার অনেকে কম্পিউটার অপারেটরের ওপর পুরো দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন। ফলে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় বারবার একই ধরনের ভুল হচ্ছে, যা পরবর্তীতে জরিমানা ও নোটিশের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

নিচে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন (e-Return) দাখিলের সময় সবচেয়ে বেশি হওয়া ৫টি সাধারণ ভুল সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো—

১. আয়ের উৎস ভুলভাবে নির্বাচন করা

রিটার্ন পূরণের প্রথম ধাপেই অনেকে হোঁচট খান আয়ের উৎস (Sources of Income) নির্বাচনের সময়। এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যেমন, কেউ চাকরি করলেও তার চাকরির পাশাপাশি অন্য খাত থেকেও আয় থাকতে পারে। অনেক করদাতা শুধু চাকরির আয় প্রদর্শন করেন, যার ফলে তার অন্যান্য বৈধ আয়ও (অপ্রদর্শিত থাকায়) অবৈধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার অনেক করদাতার ফাইলে প্রচুর কৃষি জমি দেখালেও কৃষি খাত থেকে কোনো আয় দেখান না, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সমাধান: রিটার্ন তৈরি করা পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে আপনার সব আয়ের উৎস তালিকাভুক্ত করুন এবং প্রতিটি উৎসের জন্য অনলাইনে সঠিক ক্যাটাগরি চিহ্নিত করুন।

২. ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয়পত্রের তথ্য গোপন রাখা

অনেকে মনে করেন, "এই অ্যাকাউন্টে তো বেশি টাকা নেই, দেখানো দরকার নেই" এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং এটি অন্যতম প্রধান ভুল যা করদাতারা করেন।

আপনার প্রতিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে NID এবং TIN লিঙ্ক করা আছে। আয়কর বিভাগ এই তথ্যের মাধ্যমে আপনার সব লেনদেন অত্যন্ত সহজেই ট্র্যাক করতে পারে। তাই যদি আপনি কোনো অ্যাকাউন্ট লুকিয়ে রাখেন, এবং পরবর্তীতে তা ধরা পড়ে, তখন আপনার বিরুদ্ধে আয়কর বিভাগ আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

সমাধান: আপনার সব সক্রিয় ব্যাংক হিসাব এবং সঞ্চয়পত্রের তথ্য সঠিক সমাপনী ব্যালেন্সের তথ্য প্রদর্শন নিশ্চিত করুন পরিমাণ কম হলেও।

৩. জীবনযাত্রার ব্যয় (Expenditure) এর হিসাবে গরমিল

অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় IT-10BB ফরমে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখ করতে হয়। এই জায়গাটি অনেকেই হয় খুব বেশি দেখান, অথবা খুব কম দুটোই সমস্যা তৈরি করে। যদি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখান, তাহলে আয়কর কর্মকর্তা প্রশ্ন করবে আপনার এত বেশি খরচ, এই টাকার উৎস কী? আর যদি খুব কম দেখান, তাহলে তা বাস্তবসম্মত মনে হবে না।

টিপস: একটি সহজ ফর্মুলা অনুসরণ করুনঃ 
জীবনযাত্রার ব্যয় = মোট বার্ষিক আয় − মোট বার্ষিক সঞ্চয় ও বিনিয়োগ
এভাবে আপনার ব্যয়ের একটি যুক্তিসঙ্গত এবং বিশ্বাসযোগ্য চিত্র তৈরি হবে।

💼 Tax Consultant
আয়কর সংক্রান্ত পরামর্শ ও ট্যাক্স রিটার্ন সাবমিটে সহযোগিতার জন্য...

৪. বিনিয়োগ জনিত কর রেয়াত (Tax Rebate) দাবিতে ভুল

কর কমানোর সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হলো বিনিয়োগে রেয়াত দাবি করা- জীবন বীমা, DPS, সঞ্চয়পত্র প্রভৃতিতে। কিন্তু এই জায়গাটিতেও অনেকে ভুল করেন। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দুটো সমস্যা: 
প্রথমত, করদাতারা ভুল ক্যাটাগরিতে অ্যামাউন্ট বসান।
দ্বিতীয়ত, অনেকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আইনে যে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত রেয়াত পাওয়ার বিধান আছে, তার চেয়ে বেশি দাবি করেন।

আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী রেয়াতের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সীমা অতিক্রম করে দাবি করলে আপনার মোট প্রদেয় কর ভুলভাবে হিসাব হবে এবং তা পরবর্তীতে জটিলতার সূচনা করবে।

সমাধান: রেয়াত দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের সব প্রমাণপত্র হাতের কাছে রাখুন, মিথ্যা তথ্য পরিহার করুন এবং অনুমোদিত সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

৫. সম্পদ ও দায় (Assets & Liabilities) এর সঠিক বিবরণ না দেওয়া

যাদের মোট সম্পদ ৫০ লক্ষ টাকার উপরে, অথবা যাদের সিটি কর্পোরেশনে বাড়ি বা একটি গাড়ি আছে, তাদের জন্য IT-10B ফর্ম পূরণ করা একেবারে বাধ্যতামূলক। এই ফর্মে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল করেন, আগের বছরের সমাপনী সম্পদের (Closing Wealth) সাথে চলতি বছরের সম্পদের সঠিক সমন্বয় রাখতে ভুলে যান।

মনে রাখবেন, আপনার Net Wealth হলো মোট সম্পদ থেকে মোট দায় (ঋণ) বাদ দেওয়া অবশিষ্ট অংশ। আগের বছর ও এই বছরের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য থাকলে আপনার রিটার্ন Inconsistent হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

সমাধান: আগের বছরের রিটার্নের সম্পদ বিবরণী পাশে রেখে এই বছরের ফর্ম পূরণ করুন। নতুন সম্পদ যোগ বা পুরনো সম্পদ বিক্রির তথ্য সঠিকভাবে আপডেট করুন।

বোনাস সতর্কতাঃ 'Final Submit' এর আগে অবশ্যই প্রিভিউ দেখুন

অনলাইনে একবার 'Submit' বাটনে ক্লিক করলে সেটি সংশোধন করা অত্যন্ত জটিল। অনেক সময় দেখা যায়, টাইপিং ভুলের কারণে একটা শূন্য (০) কম বা বেশি হয়ে গেছে যা পুরো হিসাবকে উল্টে দিতে পারে। তাই সাবমিট করার আগে Preview অপশনে গিয়ে পুরো ফর্মটি অন্তত দুবার পড়ে নিশ্চিত করুন সব তথ্য সঠিক আছে কি না।

Share to:

CATEGORIES:

Popular Posts