🔖 সংক্ষিপ্ত পরিচয়
| পূর্ণ নাম | মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ |
| জন্ম তারিখ | ১২ মে ১৯৬৬ |
| পদবি | গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক |
| যোগদান | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ |
| শিক্ষা | বি.কম (সম্মান) ও এম.কম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এফসিএমএ, আইসিএমএবি |
| পেশা | উদ্যোক্তা, সিএমএ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার |
| ক্রম | বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর |
১. ভূমিকা
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটি ব্যতিক্রমী দিন। এই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে যোগ দেন মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ — একজন ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং কস্ট ও ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে তিনিই প্রথম গভর্নর যিনি পেশাদার অর্থনীতিবিদ বা আমলা নন, বরং সরাসরি ব্যবসায়িক জগৎ থেকে এই পদে এসেছেন। তাঁর নিয়োগ একদিকে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি নতুন প্রত্যাশার দরজাও খুলে দিয়েছে। কে এই মোস্তাকুর রহমান? কোথা থেকে এলেন? কী তাঁর যোগ্যতা? মানুষের মনে যে প্রশ্নগুলো ঘুরছে, সেগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই লেখার অবতারণা।
২. প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
মো. মোস্তাকুর রহমান ১৯৬৬ সালের ১২ মে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল সম্পূর্ণরূপে ঢাকাকেন্দ্রিক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৮৭ সালে বি.কম (সম্মান) এবং ১৯৮৮ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের পরেই তিনি মনোযোগ দেন পেশাদার সনদ অর্জনে।
১৯৯২ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে সিএমএ সনদ লাভ করেন এবং পরবর্তীতে ফেলো মেম্বার হিসেবে এফসিএমএ উপাধি অর্জন করেন। এই উপাধি তাঁর নামের সাথে সর্বদা উচ্চারিত হয় এবং তাঁর পেশাদার পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
🎓 শিক্ষার সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন
- ১৯৮৭: বি.কম (সম্মান), হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- ১৯৮৮: এম.কম, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- ১৯৯২: সিএমএ সনদ, আইসিএমএবি
- পরবর্তীতে: এফসিএমএ (ফেলো মেম্বার), আইসিএমএবি
৩. পেশাদার জীবন ও ক্যারিয়ার
শিক্ষা ও পেশাদার সনদ অর্জনের পর মোস্তাকুর রহমান সরাসরি কর্পোরেট বা সরকারি চাকরির দিকে না গিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথ বেছে নেন। এটিই তাঁকে তাঁর পূর্বসূরি গভর্নরদের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা করে তোলে।
তিনি নারায়ণগঞ্জে পরিবেশবান্ধব গার্মেন্ট কারখানা হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু গার্মেন্টেই নয়, তাঁর ব্যবসায়িক পরিধি ছিল বহুমুখী — রিয়েল এস্টেট, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং শিল্প উদ্যোগসহ একাধিক খাতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনে ভূমিকা
তিনি বিজিএমইএ-র বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি নিচের সংগঠনগুলোর সাথে যুক্ত ছিলেন:
- বিজিএমইএ (বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন)
- রিহ্যাব (রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ)
- আটাব (অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ)
- ডিসিসিআই (ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ)
৪. পেশাদার অর্জন ও স্বীকৃতি
মোস্তাকুর রহমানের পেশাদার অর্জনের তালিকা বহুমাত্রিক। কর্পোরেট ফাইন্যান্স, রপ্তানি অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক গভর্ন্যান্স এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কার্যকর নেতৃত্ব দিয়েছেন।
৩৩+ বছর
পোস্ট-কোয়ালিফিকেশন অভিজ্ঞতা
এফসিএমএ
আইসিএমএবি ফেলো মেম্বার
১৪তম গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক (২০২৬)
প্রথম
ব্যবসায়ী পটভূমির গভর্নর
৫. পেশা ও সমাজে অবদান
মোস্তাকুর রহমানের অবদান শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিজিএমইএ-র স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি তৈরি পোশাক শিল্পের হাজার হাজার উদ্যোক্তার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে নীতি-সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন।
গভর্নর হিসেবে যোগদানের প্রথম দিনেই তিনি ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের সাথে বৈঠকে ১১টি মূল অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন, যার মধ্যে ছিল — সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিমুখী বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সুদের হার হ্রাস।
এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন দাতব্য ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত বলে জানা গেছে।
৬. দক্ষতা, বিশেষজ্ঞতা ও নেতৃত্বশৈলী
মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বশৈলী মূলত একজন উদ্যোক্তার মতো — সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্রুততা, বাস্তব সমস্যার দিকে মনোযোগ এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার প্রবণতা।
৭. ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি
ইনশাআল্লাহ, আমি প্রথমে ব্যাংকে বসব, সবার সাথে পরামর্শ করব এবং সহযোগিতার মাধ্যমে প্রধান কাজে মনোযোগ দেব — ব্যাংকিংয়ে আস্থা তৈরি করা, শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা।
মোস্তাকুর রহমান গভর্নর হিসেবে তাঁর প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন "ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো।" তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে বেসরকারি খাত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ, সুদের হার কমানোর মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করা এবং দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিমুখী বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।
৮. বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ
⚠️ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ: এই অনুচ্ছেদে বিভিন্ন সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের প্রকাশিত মতামত ও অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো অভিযোগ পর্যায়ে রয়েছে, প্রমাণিত সত্য নয়।
মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাঁর নিয়োগের তীব্র সমালোচনা করেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেছেন যে, নতুন গভর্নরের ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রহীতা হিসেবে, যা পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছিল এবং বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতফসিল করা হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান সতর্ক করেছেন যে, ব্যবসায়িক পটভূমির কেউ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হলে স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঝুঁকি থাকে। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাথমিক দায়িত্ব — মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া — কর্পোরেট স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এ ছাড়া তাঁর পূর্বসূরি আহসান এইচ মনসুর-এর প্রস্থানের পরিস্থিতিও বিতর্কিত ছিল — একদল কর্মকর্তার আন্দোলনের মধ্যে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন, যাকে তিনি নিজে "ষড়যন্ত্র" বলে অভিহিত করেছিলেন।
৯. প্রভাব ও উত্তরাধিকার
মোস্তাকুর রহমান এখনো তাঁর পথচলার একেবারে শুরুতে। কিন্তু তাঁর নিয়োগ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসে একটি বাঁকবদলের মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তিনিই প্রথম গভর্নর যিনি সরাসরি ব্যবসায়িক পটভূমি থেকে এই পদে এসেছেন।
তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক — খেলাপি ঋণের সংকট, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্নির্মাণ এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় তিনি কতটা সফল হন, সেটিই নির্ধারণ করবে তাঁর উত্তরাধিকার।
উপসংহার
মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে, সিএমএ সনদ অর্জন করে, তৈরি পোশাক শিল্পসহ একাধিক খাতে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি আজ দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান।
তাঁর সাফল্য নির্ভর করবে তিনি কতটা দ্রুততার সাথে একজন ব্যবসায়ী মানসিকতা থেকে একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে উত্তরণ ঘটাতে পারেন। বাংলাদেশের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অনেকটা নির্ভর করছে এই উত্তরণের উপর।
📚 তথ্যসূত্র:
- বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (সিরিয়াল নং ০৫/২০২৬-৯৮)
- বিডিনিউজ২৪ — Mostaqur Rahman appointment coverage
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBSNews) — Who is Mostaqur Rahman?
- উইকিপিডিয়া — Md Mostaqur Rahman
- মো. মোস্তাকুর রহমানের ব্যক্তিগত সিভি (CV)