সোনা ও রুপার যাকাতের হার কত? ব্যবহৃত গহনায় কি যাকাত ফরজ?

calendar_today

সোনা ও রুপার যাকাতের হার

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, নিসাব পরিমাণ (নির্দিষ্ট সীমা) সোনা বা রুপা এক বছর মালিকানায় থাকলে তার ওপর ২.৫% (বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ) হারে যাকাত প্রদান করা ফরজ।

  • স্বর্ণের নিসাব: ৭.৫ ভরি (তোলা)।

  • রুপার নিসাব: ৫২.৫ ভরি (তোলা)।

যদি কারো কাছে এই পরিমাণ বা এর চেয়ে বেশি সম্পদ থাকে, তবে প্রতি ১০০ টাকার মূল্যে ২.৫০ টাকা যাকাত দিতে হবে।

নারীর ব্যক্তিগত গহনায় যাকাত ফরজ কি?

এই বিষয়ে ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে:

ড. মিজানুর রহমান আজহারী

নারীর ব্যবহৃত স্বর্ণালঙ্কারের যাকাত বিষয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সাবলীল বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রধান বিধান ও মাযহাবগত পার্থক্যঃ ড. মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, স্বর্ণ বা রুপার গহনা যদি নিসাব পরিমাণ হয় (স্বর্ণ ৭.৫ ভরি বা রুপা ৫২.৫ ভরি), তবে তাতে যাকাত ফরজ। তবে ব্যবহৃত গহনার ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে দুটি প্রধান মত রয়েছে:

  • ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মত: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, স্বর্ণ বা রুপা ব্যবহৃত হোক বা জমিয়ে রাখা হোক, যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়, তবে তার ওপর যাকাত দেওয়া ফরজ।
  • অন্যান্য তিন মাযহাবের মত: ইমাম শাফিঈ, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.)-এর মতে, নারীদের নিত্যদিন ব্যবহৃত স্বাভাবিক স্বর্ণালঙ্কারের ওপর যাকাত নেই।

কেন যাকাত দেওয়া নিরাপদ?

আজহারী সাহেব হানাফী মাযহাবের মতটিকে শক্তিশালী ও নিরাপদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, স্বর্ণ বা রুপা এমন একটি সম্পদ যা সরাসরি 'ক্যাশ' বা নগদের মতো কাজ করে। এটি বিপদের বন্ধু এবং চাইলেই যেকোনো সময় বিক্রি করে টাকা পাওয়া যায়। তাই আপনার কাছে থাকা সম্পদ যদি গরীবের হক আদায়ের সীমার (নিসাব) মধ্যে থাকে, তবে তা থেকে ২.৫% যাকাত বের করে দেওয়াই হচ্ছে ঈমানের দাবি এবং নিরাপদ পদ্ধতি।

ভিডিও লিংক

শায়খ আহমাদুল্লাহ

শায়খ গহনার যাকাত নিয়ে অত্যন্ত চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। শায়খের মূল কথাগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:

ব্যবহৃত স্বর্ণের যাকাত নিয়ে ওলামাদের দুটি মত

শায়খ আহমাদুল্লাহ শুরুতেই পরিষ্কার করেছেন যে, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি শক্তিশালী মত রয়েছে:

  • প্রথম মত (অধিকাংশ আলেম): ইমাম শাফিঈ, মালিক ও আহমদ (র.)-এর মতে, নারীদের নিত্যদিন ব্যবহৃত স্বাভাবিক অলঙ্কারে যাকাত নেই। যদি তা ব্যবহারের জন্য হয় এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে না হয়।

  • দ্বিতীয় মত (হানাফী মাযহাব): ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে, স্বর্ণ বা রুপা যে অবস্থাতেই থাকুক (ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত), যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ।

শায়খ আহমাদুল্লাহর নিজস্ব বিশ্লেষণ ও পরামর্শ

শায়খ আহমাদুল্লাহ হানাফী মাযহাবের মতটিকে অধিকতর নিরাপদ এবং শক্তিশালী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন: কুরআনের আয়াত এবং হাদিসের সাধারণ নির্দেশনায় সোনা-রুপার ওপর যাকাত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত আলাদা করা হয়নি।

হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক মহিলার হাতে সোনার দুটি চুড়ি দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তুমি কি এর যাকাত দাও?" তিনি 'না' বলায় রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছিলেন। এই হাদিসটি ব্যবহৃত গহনায় যাকাত ফরজের একটি বড় দলিল।

ভিডিও লিংক

শায়খ মতিউর রহমান মাদানী

ব্যবহৃত স্বর্ণের যাকাত এবং মেয়ের স্বর্ণের যাকাত নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। আলোচনার মূল কথাগুলো নিচে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো:

ব্যবহৃত স্বর্ণের যাকাত কি জরুরি?

শায়খ জানান যে, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য (ইখতিলাফ) আছে: হাম্বলী মাযহাব অনুযায়ী ব্যবহৃত স্বর্ণ বা অলঙ্কারে যাকাত ফরজ নয়। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী স্বর্ণ যেভাবেই থাকুক না কেন (ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত), নিসাব পরিমাণ হলে তাতে যাকাত ফরজ।

মেয়ের স্বর্ণের যাকাত

জনৈক নারী তার মেয়ের ছোটবেলার উপহার পাওয়া স্বর্ণের যাকাত নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। এ বিষয়ে শায়খ মাদানী বলেন, যাকাতের হিসাব করার সময় মালিকানা গুরুত্বপূর্ণ। মা এবং মেয়ের স্বর্ণ একসাথে মিলিয়ে হিসাব করার প্রয়োজন নেই। যদি মেয়ের নামে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ পৃথকভাবে সাত ভরি বা ৭.৫ তোলার বেশি হয়, তবেই কেবল তার ওপর যাকাত আসবে। যদি বাড়িতে মা ও মেয়ের সবার স্বর্ণ মিলিয়ে ১০ ভরি হয়, কিন্তু পৃথকভাবে কারো স্বর্ণই ৭.৫ ভরি বা নিসাব পরিমাণ না হয়, তবে কারো ওপরই যাকাত ফরজ হবে না।

সর্তকতাঃ শায়খ মতিউর রহমান মাদানী পরামর্শ দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র নিজের সুবিধার জন্য কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের হালকা বা সহজ ফতোয়া খোঁজা ঠিক নয়। বরং কুরআন-সুন্নাহ ও অধিক সতর্কতার কথা বিবেচনা করে গহনার যাকাত দেওয়াটাই বেশি নিরাপদ।

ভিডিও লিংক

Share to:

CATEGORIES:

Popular Posts